ঢাকা ১১:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিজেদের আয়ের ডলারে প্রথমবার তেলের দাম পরিশোধ বিপিসির

নিজস্ব সংবাদ :

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেটরদের কাছে উড়োজাহাজের জ্বালানি ‘জেট এ-১’ বা ‘জেট ফুয়েল’ বিক্রির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা (মার্কিন ডলার) আয় করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বর্তমানে জেট ফুয়েল বিক্রির আয়ের এসব ডলার স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর না করে সরাসরি আমদানি বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর পর প্রথমবারের মতো নিজেদের আয়ের বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা তেলের দাম পরিশোধ করেছে সরকারি সংস্থাটি। এতে প্রথম পার্সেলেই পাঁচ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি। ফলে ডলার বিনিময় হারের তারতম্যে বর্তমান হিসাবে বছরে শত কোটি টাকার মতো সাশ্রয়ের আশা করছে বিপিসির।

বিপিসি বলছে, তরল জ্বালানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল পিএলসি দেশের বিমানবন্দরগুলোয় উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহ দেয়। দেশি রুটে চলাচলকারী উড়োজাহাজ থেকে স্থানীয় মুদ্রা টাকায় বিল পেলেও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারে বিল আদায় হতো।

আর বিদেশি ফ্লাইট অপারেটররা এই জ্বালানির মূল্য ডলারে পরিশোধ করলেও পদ্মা অয়েলের নিজস্ব কোনো ‘বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব’ বা ‘এফসি অ্যাকাউন্ট’ ছিল না। এতে তারা স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে তা তাৎক্ষণিকভাবে টাকায় (টিটি ক্লিন রেটে) রূপান্তর করে ফেলতো। ফলে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ও টিটি ক্লিনের রেটের মধ্যে তফাতের কারণে ডলারপ্রতি কমবেশি এক টাকা গচ্চা দিতে হতো।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি নানামুখী দেনদরবারের মাধ্যমে বিপিসি ও পদ্মা অয়েল আলাদাভাবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে এফসি অ্যাকাউন্ট খুলে জেট ফুয়েল বিক্রির আয়ের মার্কিন ডলার জমা রাখছে। গত ২ জুন থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এতে গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি ও পদ্মা অয়েলের দুই হিসাবে ১১ কোটি ১১ লাখ ৯৭ হাজার ৭১১ মার্কিন ডলার জমা হয়। ৩১ আগস্ট জ্বালানি তেল আমদানির একটি চালানের বিল হিসেবে তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ ডলার ৫০ সেন্ট পরিশোধ করা হয়। সবশেষ ১০ সেপ্টেম্বর ওই দুই হিসাবে জমা রয়েছে ৯ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলার।

এর আগে গত ১৯ আগস্ট বিপিসির আমদানি করা ৩০ হাজার ৪৪৭ টন ডিজেলের চালান নিয়ে বাংলাদেশে আসে ‘এমটি চাং হ্যাং ফেং চাই’। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডকে গত ৩১ আগস্ট চালানটির বিল নিজের আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে পরিশোধ করে বিপিসি।

বিদেশ থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য প্রতি মাসেই বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলারের এলসি (ঋণপত্র) খুলতে হয় বিপিসিকে। জেট ফুয়েল বিক্রির ডলার স্থানীয় মুদ্রায় (টাকা) রূপান্তর করতো পদ্মা অয়েল। আর সোনালী ব্যাংকের বিসি সেলিং রেটে ডলার কিনে আমদানির বিল পরিশোধ করতে হতো।

সবশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকে বিসি সেলিং রেট ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা। কিন্তু টিটি ক্লিন রেট ১২২ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ, এফসি অ্যাকাউন্ট না থাকলে একই পণ্য কিনে বিক্রিলব্ধ অর্থ দিয়ে আমদানি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলার প্রতি কমপক্ষে এক টাকা গচ্চা দিতে হতো বিপিসিকে।

আমদানি করা ডিজেলের চালানের বিপরীতে পরিশোধ করা তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ ডলারে ডলারপ্রতি এক টাকা হিসাবে বিপিসির সাশ্রয় হয়েছে তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ টাকা।

পাশাপাশি এক প্রতিবেদনে বিপিসি দাবি করছে, এলসি খুলতে আমদানিমূল্য পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা গচ্ছিত রাখতে হয়। জমানো এসব টাকার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ হারে মুনাফা দেয়। কিন্তু এফসি অ্যাকাউন্টে এলসি মূল্যের বিপরীতে কোনো টাকা জমা রাখতে হয় না। ফলে একই পরিমাণ টাকা অন্য ব্যাংকে কমপক্ষে দুই শতাংশ বেশি মুনাফায় জমা রাখা যায়। এতে তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ ডলারের বিপরীতে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা বেশি মুনাফা হবে বিপিসির। ফলে এ পার্সেলে চার কোটি ৯২ লাখ টাকার মতো সাশ্রয় হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অন্য পেট্রোলিয়াম জ্বালানির মতো জেট ফুয়েলের দামও নির্ধারণ করে। সবশেষ ৪ সেপ্টেম্বর জেট ফুয়েলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে বিইআরসি। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ১৬৫ দশমিক ৬৫ টাকা (শুল্ক ও মূসকসহ) এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক শূন্য ৭৭ মার্কিন ডলার।

বিপিসির জেট ফুয়েল শতভাগ বিক্রি করে পদ্মা অয়েল পিএলসি। তথ্য বলছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৯৪ টন, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার ২৪ টন, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৫৩৫ টন, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪১ হাজার ৩৩ টন জেট ফুয়েল বিক্রি করেছে বিপিসি।

সবশেষ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিক্রি করেছে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টন জেট এ-১ (জেট ফুয়েল)। অর্থাৎ, বিগত অর্থবছরে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টন বা ৬৮ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ৩৭২ লিটার (প্রতিটনে ১২৪৩ লিটার) জেট ফুয়েল বিক্রি করেছে বিপিসি। যা বিইআরসির বর্তমান ঘোষিত আন্তর্জাতিক রুটের রেটে বিক্রিমূল্য দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫১ হাজার ২৪০ ডলার। জেট ফুয়েল বিক্রিতে প্রতি বছর ৮ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ডলারের ক্রয়মূল্য ১২২ টাকা ৩৫ পয়সা এবং বিক্রিমূল্য ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা। অর্থাৎ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ডলারপ্রতি ক্রয়-বিক্রয়ে তারতম্য ১ টাকা ২০ পয়সা। সোনালী ব্যাংক পিএলসিতে ১৩ সেপ্টেম্বর ডলারের বিসি রেট ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা এবং টিটি ক্লিন রেট ১২২ টাকা ৬০ পয়সা। তাতে ডলারপ্রতি তারতম্য ১ টাকা । ফলে এক টাকা তারতম্যের হিসাবে জেট ফুয়েল বিক্রির ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫১ হাজার ২৪০ ডলারে সমপরিমাণ ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫১ হাজার ২৪০ টাকা সাশ্রয় হতো।

তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক রুটের উড়োজাহাজে জেট ফুয়েল বিক্রি করা মূল্য মার্কিন ডলারে সংগ্রহের জন্য ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে বিপিসি। পরবর্তীসময়ে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হলেও ২০২৫ সালে পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা অ্যাভিয়েশন ডিপোতে বিপিসি, পদ্মা অয়েল, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এইচএসবিসি ব্যাংকের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সভা হয়।

সবশেষ চলতি বছরের ৮ মার্চ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে বিপিসি ও পদ্মা অয়েলের এফসি অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেয়। ধারাবাহিক পদক্ষেপে গত ২ জুন থেকে এফসি অ্যাকাউন্টে জেট ফুয়েল বিক্রি ডলার জমা করে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট অপারেটররা।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের মধ্যে জেট ফুয়েল বিক্রি থেকে অর্জিত মার্কিন ডলার দিয়ে আমদানি চালানের বিল পরিশোধের মধ্যে স্বস্তির কথা বলছে বিপিসি।

আগে এসব ডলার টিটি ক্লিন রেটে বিক্রি করে দিতে হতো। তখন ডলার প্রতি এক টাকা কম পাওয়া যেত। আবার এলসি মূল্য পরিশোধে বিসি রেটে বেশি দরে ডলার কিনতে হতো। এতে ডলারপ্রতি এক টাকা বেশি খরচ করতে হতো বিপিসিকে।-বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ

কথা হলে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন বিপণন বিভাগে কাজ করেছি। অর্থ বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদেশি উড়োজাহাজে জেট ফুয়েল বিক্রির বিপরীতে ডলার সরাসরি নিজেদের এফসি অ্যাকাউন্টে নেওয়ার পদক্ষেপ নিই। এর মধ্যে পরিচালক (অর্থ) ম্যাডামের নিরলস প্রচেষ্টায় এফসি অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হয়েছে। এখন বিদেশি উড়োজাহাজ অপারেটরগুলো ডলারে তাদের জ্বালানির বিল পরিশোধ করছে।’

তিনি বলেন, ‘আগে এসব ডলার টিটি ক্লিন রেটে বিক্রি করে দিতে হতো। তখন ডলার প্রতি এক টাকা কম পাওয়া যেত। আবার এলসি মূল্য পরিশোধে বিসি রেটে বেশি দরে ডলার কিনতে হতো। এতে ডলারপ্রতি এক টাকা বেশি খরচ করতে হতো বিপিসিকে।’

এখন জেট ফুয়েল বিক্রি থেকে পাওয়া ডলার দিয়ে এলসিমূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপিসির বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে। ইতোমধ্যে এফসি অ্যাকাউন্টে জমানো ডলার থেকে আমরা একটি আমদানি চালানের এলসি বিল পরিশোধ করেছি। বর্তমানে যা জমা আছে তাতে আরও তিনটির মতো চালানের বিল পরিশোধ করা সম্ভব হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ১০:১৫:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজেদের আয়ের ডলারে প্রথমবার তেলের দাম পরিশোধ বিপিসির

আপডেট সময় ১০:১৫:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেটরদের কাছে উড়োজাহাজের জ্বালানি ‘জেট এ-১’ বা ‘জেট ফুয়েল’ বিক্রির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা (মার্কিন ডলার) আয় করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বর্তমানে জেট ফুয়েল বিক্রির আয়ের এসব ডলার স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর না করে সরাসরি আমদানি বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০ বছর পর প্রথমবারের মতো নিজেদের আয়ের বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা তেলের দাম পরিশোধ করেছে সরকারি সংস্থাটি। এতে প্রথম পার্সেলেই পাঁচ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি। ফলে ডলার বিনিময় হারের তারতম্যে বর্তমান হিসাবে বছরে শত কোটি টাকার মতো সাশ্রয়ের আশা করছে বিপিসির।

বিপিসি বলছে, তরল জ্বালানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল পিএলসি দেশের বিমানবন্দরগুলোয় উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহ দেয়। দেশি রুটে চলাচলকারী উড়োজাহাজ থেকে স্থানীয় মুদ্রা টাকায় বিল পেলেও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারে বিল আদায় হতো।

আর বিদেশি ফ্লাইট অপারেটররা এই জ্বালানির মূল্য ডলারে পরিশোধ করলেও পদ্মা অয়েলের নিজস্ব কোনো ‘বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব’ বা ‘এফসি অ্যাকাউন্ট’ ছিল না। এতে তারা স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে তা তাৎক্ষণিকভাবে টাকায় (টিটি ক্লিন রেটে) রূপান্তর করে ফেলতো। ফলে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ও টিটি ক্লিনের রেটের মধ্যে তফাতের কারণে ডলারপ্রতি কমবেশি এক টাকা গচ্চা দিতে হতো।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি নানামুখী দেনদরবারের মাধ্যমে বিপিসি ও পদ্মা অয়েল আলাদাভাবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে এফসি অ্যাকাউন্ট খুলে জেট ফুয়েল বিক্রির আয়ের মার্কিন ডলার জমা রাখছে। গত ২ জুন থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এতে গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি ও পদ্মা অয়েলের দুই হিসাবে ১১ কোটি ১১ লাখ ৯৭ হাজার ৭১১ মার্কিন ডলার জমা হয়। ৩১ আগস্ট জ্বালানি তেল আমদানির একটি চালানের বিল হিসেবে তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ ডলার ৫০ সেন্ট পরিশোধ করা হয়। সবশেষ ১০ সেপ্টেম্বর ওই দুই হিসাবে জমা রয়েছে ৯ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলার।

এর আগে গত ১৯ আগস্ট বিপিসির আমদানি করা ৩০ হাজার ৪৪৭ টন ডিজেলের চালান নিয়ে বাংলাদেশে আসে ‘এমটি চাং হ্যাং ফেং চাই’। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডকে গত ৩১ আগস্ট চালানটির বিল নিজের আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে পরিশোধ করে বিপিসি।

বিদেশ থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য প্রতি মাসেই বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলারের এলসি (ঋণপত্র) খুলতে হয় বিপিসিকে। জেট ফুয়েল বিক্রির ডলার স্থানীয় মুদ্রায় (টাকা) রূপান্তর করতো পদ্মা অয়েল। আর সোনালী ব্যাংকের বিসি সেলিং রেটে ডলার কিনে আমদানির বিল পরিশোধ করতে হতো।

সবশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকে বিসি সেলিং রেট ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা। কিন্তু টিটি ক্লিন রেট ১২২ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ, এফসি অ্যাকাউন্ট না থাকলে একই পণ্য কিনে বিক্রিলব্ধ অর্থ দিয়ে আমদানি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলার প্রতি কমপক্ষে এক টাকা গচ্চা দিতে হতো বিপিসিকে।

আমদানি করা ডিজেলের চালানের বিপরীতে পরিশোধ করা তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ ডলারে ডলারপ্রতি এক টাকা হিসাবে বিপিসির সাশ্রয় হয়েছে তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ টাকা।

পাশাপাশি এক প্রতিবেদনে বিপিসি দাবি করছে, এলসি খুলতে আমদানিমূল্য পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা গচ্ছিত রাখতে হয়। জমানো এসব টাকার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ হারে মুনাফা দেয়। কিন্তু এফসি অ্যাকাউন্টে এলসি মূল্যের বিপরীতে কোনো টাকা জমা রাখতে হয় না। ফলে একই পরিমাণ টাকা অন্য ব্যাংকে কমপক্ষে দুই শতাংশ বেশি মুনাফায় জমা রাখা যায়। এতে তিন কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪২ ডলারের বিপরীতে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা বেশি মুনাফা হবে বিপিসির। ফলে এ পার্সেলে চার কোটি ৯২ লাখ টাকার মতো সাশ্রয় হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অন্য পেট্রোলিয়াম জ্বালানির মতো জেট ফুয়েলের দামও নির্ধারণ করে। সবশেষ ৪ সেপ্টেম্বর জেট ফুয়েলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে বিইআরসি। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ১৬৫ দশমিক ৬৫ টাকা (শুল্ক ও মূসকসহ) এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক শূন্য ৭৭ মার্কিন ডলার।

বিপিসির জেট ফুয়েল শতভাগ বিক্রি করে পদ্মা অয়েল পিএলসি। তথ্য বলছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৯৪ টন, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার ২৪ টন, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৫৩৫ টন, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪১ হাজার ৩৩ টন জেট ফুয়েল বিক্রি করেছে বিপিসি।

সবশেষ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিক্রি করেছে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টন জেট এ-১ (জেট ফুয়েল)। অর্থাৎ, বিগত অর্থবছরে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টন বা ৬৮ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ৩৭২ লিটার (প্রতিটনে ১২৪৩ লিটার) জেট ফুয়েল বিক্রি করেছে বিপিসি। যা বিইআরসির বর্তমান ঘোষিত আন্তর্জাতিক রুটের রেটে বিক্রিমূল্য দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫১ হাজার ২৪০ ডলার। জেট ফুয়েল বিক্রিতে প্রতি বছর ৮ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ডলারের ক্রয়মূল্য ১২২ টাকা ৩৫ পয়সা এবং বিক্রিমূল্য ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সা। অর্থাৎ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ডলারপ্রতি ক্রয়-বিক্রয়ে তারতম্য ১ টাকা ২০ পয়সা। সোনালী ব্যাংক পিএলসিতে ১৩ সেপ্টেম্বর ডলারের বিসি রেট ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা এবং টিটি ক্লিন রেট ১২২ টাকা ৬০ পয়সা। তাতে ডলারপ্রতি তারতম্য ১ টাকা । ফলে এক টাকা তারতম্যের হিসাবে জেট ফুয়েল বিক্রির ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫১ হাজার ২৪০ ডলারে সমপরিমাণ ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ৫১ হাজার ২৪০ টাকা সাশ্রয় হতো।

তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক রুটের উড়োজাহাজে জেট ফুয়েল বিক্রি করা মূল্য মার্কিন ডলারে সংগ্রহের জন্য ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে বিপিসি। পরবর্তীসময়ে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হলেও ২০২৫ সালে পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা অ্যাভিয়েশন ডিপোতে বিপিসি, পদ্মা অয়েল, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এইচএসবিসি ব্যাংকের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সভা হয়।

সবশেষ চলতি বছরের ৮ মার্চ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে বিপিসি ও পদ্মা অয়েলের এফসি অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেয়। ধারাবাহিক পদক্ষেপে গত ২ জুন থেকে এফসি অ্যাকাউন্টে জেট ফুয়েল বিক্রি ডলার জমা করে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট অপারেটররা।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের মধ্যে জেট ফুয়েল বিক্রি থেকে অর্জিত মার্কিন ডলার দিয়ে আমদানি চালানের বিল পরিশোধের মধ্যে স্বস্তির কথা বলছে বিপিসি।

আগে এসব ডলার টিটি ক্লিন রেটে বিক্রি করে দিতে হতো। তখন ডলার প্রতি এক টাকা কম পাওয়া যেত। আবার এলসি মূল্য পরিশোধে বিসি রেটে বেশি দরে ডলার কিনতে হতো। এতে ডলারপ্রতি এক টাকা বেশি খরচ করতে হতো বিপিসিকে।-বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ

কথা হলে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন বিপণন বিভাগে কাজ করেছি। অর্থ বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদেশি উড়োজাহাজে জেট ফুয়েল বিক্রির বিপরীতে ডলার সরাসরি নিজেদের এফসি অ্যাকাউন্টে নেওয়ার পদক্ষেপ নিই। এর মধ্যে পরিচালক (অর্থ) ম্যাডামের নিরলস প্রচেষ্টায় এফসি অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হয়েছে। এখন বিদেশি উড়োজাহাজ অপারেটরগুলো ডলারে তাদের জ্বালানির বিল পরিশোধ করছে।’

তিনি বলেন, ‘আগে এসব ডলার টিটি ক্লিন রেটে বিক্রি করে দিতে হতো। তখন ডলার প্রতি এক টাকা কম পাওয়া যেত। আবার এলসি মূল্য পরিশোধে বিসি রেটে বেশি দরে ডলার কিনতে হতো। এতে ডলারপ্রতি এক টাকা বেশি খরচ করতে হতো বিপিসিকে।’

এখন জেট ফুয়েল বিক্রি থেকে পাওয়া ডলার দিয়ে এলসিমূল্য পরিশোধ করা সম্ভব হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপিসির বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে। ইতোমধ্যে এফসি অ্যাকাউন্টে জমানো ডলার থেকে আমরা একটি আমদানি চালানের এলসি বিল পরিশোধ করেছি। বর্তমানে যা জমা আছে তাতে আরও তিনটির মতো চালানের বিল পরিশোধ করা সম্ভব হবে।’